আটা ও ময়দার আসল পার্থক্য কী? সুস্থ থাকতে কোনটি খাবেন এবং কোনটি বর্জন করবেন?
বাঙালি খাদ্যতালিকায় রুটি, পরোটা, লুচি কিংবা বিস্কুট—সবকিছুরই মূল ভিত্তি হলো গম। কিন্তু বাজার করতে গেলে আমরা প্রায়ই দ্বিধায় পড়ি যে কোনটি কেনা উচিত—আটা নাকি ময়দা? অনেকে মনে করেন আটা আর ময়দা একই জিনিস, কেবল রঙের পার্থক্য। কিন্তু পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, আটা ও ময়দার পার্থক্য আকাশ-পাতাল। সুস্থ থাকতে কোনটি আপনার পাতে রাখা উচিত আর কোনটি শরীরকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করছে, তা জানা এখন সময়ের দাবি।
আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা আটা ও ময়দার গঠন, পুষ্টিগুণ এবং স্বাস্থ্যের ওপর এদের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আটা এবং ময়দা উভয়ই গম থেকে তৈরি হলেও এদের উৎপাদন প্রক্রিয়া বা ম্যানুফ্যাকচারিং প্রসেস সম্পূর্ণ আলাদা।
- আটা (Atta): আটা তৈরি হয় গমের সম্পূর্ণ অংশ থেকে। একটি গমের তিনটি অংশ থাকে—ভুসি (Bran), অঙ্কুর (Germ) এবং শ্বেতসার (Endosperm)। আটা তৈরির সময় গমের এই তিনটি অংশই একসাথে পেষা হয়। ফলে গমের সব প্রাকৃতিক ফাইবার ও মিনারেল এতে অক্ষত থাকে।
- ময়দা (Maida): ময়দা তৈরির সময় গমের বাইরের পুষ্টিকর ভুসি এবং অঙ্কুর অংশ দুটি সম্পূর্ণ ফেলে দেওয়া হয়। শুধুমাত্র ভেতরের সাদা শ্বেতসার (Endosperm) অংশটি নিয়ে অত্যন্ত মিহি করে পেষা হয়। এরপর একে ধবধবে সাদা করার জন্য বিভিন্ন ব্লিচিং এজেন্ট ব্যবহার করা হয়।
নিচে একটি তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে এদের পার্থক্য পরিষ্কার করা হলো:
|
বৈশিষ্ট্য |
আটা (Whole Wheat Flour) |
ময়দা (Refined Flour) |
|
প্রক্রিয়াজাতকরণ |
কম প্রক্রিয়াজাত, প্রাকৃতিক। |
অত্যন্ত বেশি রিফাইনড ও কেমিক্যালযুক্ত। |
|
ফাইবার (আঁশ) |
প্রচুর পরিমাণে থাকে। |
প্রায় নেই বললেই চলে। |
|
রং |
হালকা বাদামী বা লালচে। |
ধবধবে সাদা। |
|
হজম প্রক্রিয়া |
ধীর গতিতে হজম হয় (দীর্ঘস্থায়ী শক্তি)। |
দ্রুত হজম হয় (তাৎক্ষণিক ক্ষুধা লাগে)। |
|
পুষ্টিগুণ |
ভিটামিন বি, আয়রন ও ম্যাগনেসিয়াম সমৃদ্ধ। |
পুষ্টিগুণ প্রায় শূন্য। |
সুস্থ জীবনধারার জন্য পুষ্টিবিদরা সবসময় আটারর তৈরি খাবার সুপারিশ করেন। এর কারণগুলো হলো:
ক) হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
আটায় থাকা ফাইবার রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটি ধমনীতে চর্বি জমতে বাধা দেয়, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
খ) ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ
আটার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) কম। এর মানে হলো, আটার রুটি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা হুট করে বেড়ে যায় না। এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
গ) কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে
আটার উচ্চ ফাইবার উপাদান পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখে এবং মলত্যাগ সহজ করে। যারা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য আটার রুটি ঔষধের মতো কাজ করে।
ময়দা দেখতে আকর্ষণীয় এবং এটি দিয়ে তৈরি খাবার সুস্বাদু হলেও এটি শরীরের জন্য বিষের মতো কাজ করতে পারে।
১. মেদ ও স্থূলতা বৃদ্ধি
ময়দা দ্রুত হজম হয়ে গ্লুকোজে পরিণত হয়। এই অতিরিক্ত গ্লুকোজ যখন খরচ হয় না, তখন তা চর্বি হিসেবে শরীরে জমা হতে থাকে। ফলে পেটের চর্বি বা ভুঁড়ি দ্রুত বাড়ে।
২. এসিডিটি ও গ্যাসের সমস্যা
ময়দায় ফাইবার না থাকায় এটি অন্ত্রে আটকে যায় এবং হজম হতে দীর্ঘ সময় নেয়। এর ফলে টক্সিন তৈরি হয়, যা থেকে দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস, এসিডিটি এবং বুক জ্বালাপোড়ার সৃষ্টি হয়।
৩. ব্লিচিং কেমিক্যালের প্রভাব
ময়দাকে সাদা করার জন্য 'বেনজোয়েল পারক্সাইড' বা 'অ্যালোক্সেন'-এর মতো কেমিক্যাল মেশানো হয়। এই উপাদানগুলো অগ্ন্যাশয়ের (Pancreas) ক্ষতি করতে পারে, যা ডায়াবেটিসের মূল কারণ।
আপনি যদি ওজন কমাতে চান বা নিজেকে ফিট রাখতে চান, তবে ময়দা আপনার তালিকার সবচেয়ে নিচে থাকা উচিত। ময়দা মানেই 'খালি ক্যালোরি' (Empty Calories), যা শরীরকে কোনো পুষ্টি দেয় না। অন্যদিকে, আটা আপনাকে দীর্ঘক্ষণ এনার্জি দেবে এবং বারংবার খাওয়ার প্রবণতা কমাবে। তাই ডায়েট চার্টে আটার রুটিই শ্রেষ্ঠ বিকল্প।
পরিশেষে বলা যায়, স্বাদের জন্য মাঝে মাঝে ময়দা দিয়ে তৈরি কেক বা বিস্কুট খাওয়া যেতে পারে, কিন্তু দৈনন্দিন খাবারের প্রধান অংশ হিসেবে অবশ্যই আটা বেছে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে গমের লাল আটা বা হোল হুইট আটা আমাদের সুস্থতার চাবিকাঠি। আপনার ছোট একটি পরিবর্তন—ময়দা বর্জন করে আটা গ্রহণ—আপনাকে বড় কোনো স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে পারে।
১. আটা ও ময়দার মধ্যে কোনটি ওজন কমাতে সাহায্য করে?
উত্তর: আটা। কারণ এতে প্রচুর ফাইবার থাকে যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে এবং ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে।
২. ময়দা কেন ধবধবে সাদা হয়?
উত্তর: ময়দাকে ব্লিচিং কেমিক্যাল (যেমন বেনজোয়েল পারক্সাইড) দিয়ে সাদা ও মিহি করা হয়।
৩. বাচ্চাদের জন্য কোনটি ভালো?
উত্তর: আটা। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল আটাতে পাওয়া যায়।
৪. ময়দা খেলে কি ডায়াবেটিস হয়?
উত্তর: অতিরিক্ত ময়দা খেলে রক্তে ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট হয়, যা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৫. পরোটা বানাতে আটা নাকি ময়দা ব্যবহার করা উচিত?
উত্তর: স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করলে আটা সেরা। তবে স্বাদের জন্য ময়দা ব্যবহার করা হয়। সুস্থ থাকতে আটার পরোটা খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
৬. আটার রুটি কেন ময়দার রুটির চেয়ে শক্ত হয়?
উত্তর: আটাতে প্রচুর ফাইবার ও গমের বাইরের আবরণ থাকে, তাই এটি ময়দার তুলনায় কিছুটা খসখসে বা শক্ত হয়।
৭. প্যাকেটজাত আটায় কি ময়দা মেশানো থাকে?
উত্তর: কিছু অসাধু কোম্পানি আটার সাথে ময়দা মেশাতে পারে। তাই বিশ্বস্ত ব্র্যান্ড বা সরাসরি গম ভাঙানো আটা কেনা নিরাপদ।
৮. গ্লুটেন কি আটা ও ময়দা দুটিতেই থাকে?
উত্তর: হ্যাঁ, গমের প্রোটিন গ্লুটেন দুটিতেই থাকে। তবে ময়দায় এর ঘনত্ব বেশি বলে তা বেশি ইলাস্টিক বা আঠালো হয়।
৯. ময়দার তৈরি খাবার কেন নেশার মতো লাগে?
উত্তর: ময়দা খেলে রক্তে হুট করে ডোপামিন এবং সুগার লেভেল বেড়ে যায়, যা আমাদের মস্তিষ্কে বারবার সেই খাবার খাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে।
১০. সুস্থ থাকতে প্রতিদিন কয়টি আটার রুটি খাওয়া উচিত?
উত্তর: এটি ব্যক্তিগত ক্যালোরির চাহিদার ওপর নির্ভর করে, তবে সাধারণত পূর্ণবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিবেলায় ২-৩টি লাল আটার রুটি আদর্শ